শাহেদ-সাবরিনা-পাপিয়াদের পতন, সিনহা-রায়হানে কেঁদেছে দেশ

বছরের শুরুতে ধ’র্ষণের ঘটনা মহামা’রি আকার ধারণ করেছিল। বছরের শেষে অবশ্য এই মহামা’রির রাশ টানা গেছে নানা কঠোর ব্যবস্থা নেয়ায়। করো’না মহামা’রির শুরুর পর রিজেন্ট হাসপাতা’লের মালিক শাহেদ করিম ও চিকিৎসক ডা. সাবরিনা চৌধুরীদের প্রতারণার কা’ণ্ডে হতবাক পুরো দেশ। যুব মহিলা লীগ নেত্রী শামীমা নূর পাপিয়ার হেরেমখানার তথ্য প্রকাশের পর তা রাজনৈতিক অঙ্গনে তুমুল ঝড় তোলে। করো’না মহামা’রির মধ্যেই কক্সবাজারে সাবেক সে’না কর্মক’র্তা সিনহা মো. রাশেদ খান হ’ত্যাকা’ণ্ড কাঁদিয়েছে পুরো দেশবাসীকে। সিলেটে পু’লিশ ফাঁড়িতে রায়হান হ’ত্যার ঘটনাও দেশজুড়ে প্রতিবাদের ঝড় তোলে।

সিনহা হ’ত্যাকা’ণ্ড: ৩১শে জুলাই রাত সাড়ে ১০টার দিকে কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভের বাহারছড়া ইউনিয়নের শামলাপুর চেকপোস্টে পু’লিশ কর্মক’র্তা লিয়াকত আলীর গু’লিতে মেজর (অব.) সিনহা মো. রাশেদ নি’হত হন। এ ঘটনায় দেশজুড়ে আলোচনার জন্ম দেয়। এ ঘটনায় চারটি মা’মলা হয়। তিনটি মা’মলা করে পু’লিশ বাদী হয়ে সিনহা ও তার দুই সহযোগীর বি’রুদ্ধে। আর সিনহার বোন শারমিন শাহরিয়ার ফেরদৌস বাদী হয়ে ৫ই আগস্ট টেকনাফ থা’নার সাবেক ভা’রপ্রাপ্ত কর্মক’র্তা (ওসি) প্রদীপ কুমা’র দাশসহ নয়জনকে আ’সামি করে একটি হ’ত্যা মা’মলা করেন। আ’দালতের নির্দেশে এই চারটি মা’মলার ত’দন্ত করে ১৩ই ডিসেম্বর ১৫ জনকে অ’ভিযু’ক্ত করে আ’দালতে অ’ভিযোগপত্র জমা দিয়েছে র‌্যা’­ব। এরমধ্যে নয়জন টেকনাফ থা’না পু’লিশের, তিনজন এপিবিএন’র বরখাস্তকৃত সদস্য এবং তিনজন বেসাম’রিক ব্যক্তি। মা’মলার ত’দন্ত করেন র‌্যা’­ব’র সিনিয়র সহকারী পু’লিশ সুপার খায়রুল ইস’লাম। দীর্ঘ ত’দন্তের পর ত’দন্ত কর্মক’র্তা অ’ভিযোগ পত্রে টেকনাফ থা’নার সাবেক বরখাস্তকৃত ওসি প্রদীপ কুমা’র দাশকে হ’ত্যার মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে উল্লেখ করেছে।

ডা. সাবরিনার করো’না টেস্ট জালিয়াতি: চিকিৎসক সংগঠনের নেতা ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এবং মন্ত্রণালয়ের অসাধু কর্মক’র্তাদের বশ করে জেকেজি হেল্‌থ কেয়ার নামের একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে করো’না পরীক্ষার অনুমতি নিয়েছিলেন জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটের কার্ডিয়াক সার্জন ডা. সাবরিনা চৌধুরী ও তার স্বামী আরিফ চৌধুরী। কোনোরকম পরীক্ষা-নীরিক্ষা ছাড়াই মানুষকে জাল সনদ দিয়ে প্রায় আট কোটি হাতিয়ে নিয়েছিলেন এই দম্পতি। বিনামূল্য করো’না পরীক্ষার অনুমতি থাকলেও জুনের শেষদিকে অ’ভিযোগ আসে বুকিং বিডি ও হেল্‌থকেয়ার নামে দু’টি সাইটের মাধ্যমে টাকা নিচ্ছিল জেকেজি। নমুনা পরীক্ষা না করে রোগীদের ভু’য়া সনদও তারা দিচ্ছিলেন। এমন অ’ভিযোগের সত্যতা পেয়ে গত ২২শে জুন জেকেজি হেল্‌থ কেয়ারের সাবেক গ্রাফিক ডিজাইনার হু’মায়ুন কবীর হিরু ও তার স্ত্রী’ তানজীন পাটোয়ারীকে গ্রে’প্তার করে পু’লিশ।

পরে তেজগাঁও থা’না পু’লিশ জেকেজি’র সিইও আরিফুল হক চৌধুরী, তার বোন জেবুন্নেছাসহ সাতজনকে গ্রে’প্তার করে। ১২ই জুলাই ডা. সাবরিনাকেও গ্রে’প্তার করা হয়। আরিফুল ও সাবরিনাকে দুই দফা রি’মান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেন ডিবি’র ত’দন্তকারীরা। সরকারি চাকরিতে থাকা অবস্থায় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে যু’ক্ত হয়ে সরকারি কর্মচারী বিধিমালা ভঙ্গ করায় সাবরিনাকে সাময়িক বরখাস্ত করে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। ত’দন্তকালে ডিবি জেকেজি’র কম্পিউটার থেকে করো’নাভাই’রাস পরীক্ষার ১৯৮৫টি ভু’য়া রিপোর্ট তারা পেয়েছে। ত’দন্ত শেষে ডা. সাবরিনাসহ আট জনকে অ’ভিযু’ক্ত করে আ’দালতে অ’ভিযোগপত্র জমা দেয় ডিবি।

ক্যাসিনো হোতা এনু-রূপনের বাসায় টাকার খনি: ২৫শে ফেব্রুয়ারি ক্যাসিনো কা’ণ্ডে গ্রে’প্তার আওয়ামী লীগ নেতা এনামুল হক এনু ও তার ভাই রূপন ভূঁইয়ার ঢাকার ওয়ারীর লালমোহন সাহা স্ট্র্রিটের ১১৯/১ মমতাজ ভিলা নামের একটি বাসার নিচতলায় অ’ভিযান চালায় র‌্যা’­ব। ওই অ’ভিযানে র‌্যা’­ব তাদের বাসার পাঁচটি লকার থেকে ২৬ কোটি ৫৫ লাখ ৬০০ টাকা (১২ বস্তা), ১ কেজি স্বর্ণ, ৫ কোটি ১৫ লাখ টাকার এফডিআরসহ বিদেশি মুদ্রা উ’দ্ধার করে র‌্যা’­ব। অ’ভিযানের পর মনে হয়েছে এটি কোনো বাসা নয় যেন বড় কোনো ব্যাংকের শাখা। ২০১৯ সালের ১৮ই সেপ্টেম’র র‌্যা’­ব ঢাকার ক্লাবপাড়ায় ক্যাসিনো বিরোধী অ’ভিযানের অংশ হিসেবে র‌্যা’­ব তাদের বাসায় অ’ভিযান চালায়। তার কয়েকদিন পর ২৪শে সেপ্টেম্বর ওয়ান্ডারার্স ক্লাবের পরিচালক ও গেণ্ডারিয়া আওয়ামী লীগের সাবেক নেতা এনামুল হক এনু ও তার ভাই রূপন ভূঁইয়ার বাড়ি ও তাদের এক কর্মচারী ও বন্ধুর বাসায় অ’ভিযান চালিয়ে পাঁচটি সিন্দুক থেকে ৫ কোটি টাকা, আট কেজি স্বর্ণ ও ৬টি আগ্নেয়াস্ত্র উ’দ্ধার করা হয়। ওই সময় তাদের দুই ভাই ও তাদের সহযোগী কাউকে গ্রে’প্তার করতে পারেনি র‌্যা’­ব। ওই সময় র‌্যা’­ব জানিয়েছিল, ওয়ান্ডারার্স ক্লাবে অ’বৈধভাবে ক্যাসিনো পরিচালনা করে এই দুইভাই বিপুল অর্থের মালিক হয়েছেন। টাকা রাখতে বেশি জায়গার প্রয়োজন তাই তারা স্বর্ণ কিনে রেখেছিলেন। কারণ কম জায়গায় অনেক টাকার স্বর্ণ রাখা যায়। ওই ঘটনার পরে দু্‌ই ভাইয়ের বি’রুদ্ধে সাতটি মা’মলা হয়।

বহুরূপী রিজেন্ট শাহেদ: রিজেন্ট হাসপাতা’লের চেয়ারম্যান মোহাম্ম’দ শাহেদ করিমের প্রতারণা দেখে স্তম্ভিত হয়েছিলেন দেশবাসী। বহুরূপী এই সাহেদ টেলিভিশন ট’কশোতে নিয়মিত অংশগ্রহণ করে বিভিন্ন অ’প’রাধ, দু’র্নীতি, রাজনীতি নিয়ে কথা বলতো। নিজেকে ক্লিন ইমেজের ব্যক্তি হিসেবে দাবি করতেন। করো’না পরীক্ষার ভু’য়া প্রতিবেদন নিয়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়া ও নানা প্রতারণার অ’ভিযোগে গত ৬ ও ৭ই জুলাই উত্তরার রিজেন্ট হাসপাতাল এবং রিজেন্ট গ্রুপের অফিসে অ’ভিযান চালায় র‌্যা’­ব। এটি করো’না ডেডিকে’টেড হাসপাতাল ছিল অথচ হাসপাতালটির কোনো লাইসেন্সই ছিল না। ওই অ’ভিযানে করো’নাভাই’রাস পরীক্ষার ভু’য়া রিপোর্ট, চিকিৎসার নামে রোগীদের কাছ থেকে কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়াসহ নানা অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া যায়। পরে রিজেন্ট হাসপাতা’লের উত্তরা ও মিরপুর শাখা বন্ধ করে দেয়া হয়। হাসপাতা’লে অ’ভিযানের পরপরই লাপাত্তা হন শাহেদ। কিছুদিন পর সাতক্ষীরার দেবহাটা থেকে তাকে গ্রে’প্তার করে র‌্যা’­ব।

যুব মহিলা লীগ নেত্রী পাপিয়াকা’ণ্ড: ২২শে ফেব্রুয়ারি হযরত শাহ’জালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে নরসিংদী জে’লা যুব মহিলা লীগের বহিষ্কৃত সাধারণ সম্পাদক শামিমা নূর পাপিয়া ও তার স্বামীকে গ্রে’প্তার করেছিল র‌্যা’­ব। সাধারণ পরিবার থেকে উঠে আসা পাপিয়া রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে গড়ে তুলেছিলেন পাপের সাম্রাজ্য। অ’বৈধ-অ’নৈতিক ব্যবসার মাধ্যমে কামিয়ে নিয়েছিলেন কোটি কোটি টাকা। যুব মহিলা লীগ নেত্রীর পরিচয়ে অ’ভিজাত ব্যক্তি ও রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে সখ্য গড়ে হেন অ’প’রাধ নেই যা পাপিয়া করেননি। বিয়ের পর স্বামী মফিজুর রহমান সুমনের হাত ধরে রাজনীতি ও অ’প’রাধকা’ণ্ডে জড়ান পাপিয়া। মাসের পর মাস ব্যবহার করেছেন পাঁচ তারকা হোটেলের প্রেসিডেন্সিয়াল স্যুট। চলাফেরা করতেন সামনে পিছনে গাড়ির বহর নিয়ে। প্রভাবশালী অনেক রাজনীতিকের সান্নিধ্যে যাওয়ার সুযোগে তাদের সঙ্গে ছবি তুলে প্রকাশ করেছেন নানা মাধ্যমে। অ’বৈধ অ’স্ত্র ব্যবসা থেকে শুরু করে মা’দক ব্যবসা, জাল নোটের ব্যবসা, তদবিরবাজি, চাঁদাবাজি, জি’ম্মি করে টাকা আদায়, নারীদের দিয়ে অ’নৈতিক ব্যবসা, অশালীন ভিডিও দিয়ে ব্ল্যাকমেইলিং, অন্ধকার জগতের সব পথেই পা দিয়েছেন তিনি। ধীরে ধীরে হয়ে ওঠেন অ’প’রাধ জগতের রানী। বাড়ি, গাড়ি, ফ্ল্যাট, প্লট করেছেন। বিদেশে টাকা পাচারসহ বিভিন্ন ব্যবসায় বিনিয়োগ করেছেন।

এমসি কলেজে গৃহবধূ গণধ’র্ষণ: ২৫শে সেপ্টেম্বর রাতে সিলেটের এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে ছাত্রলীগ নেতাকর্মী কর্তৃক গণধ’র্ষণের শিকার হন এক গৃহবধূ (২১)। ছাত্রাবাসের আঙ্গিনায় স্বামীকে আ’ট’কে রেখে প্রাইভেট’কারের ভেতর ওই গৃহবধূকে গণধ’র্ষণ করা হয়। পু’লিশ নির্যাতিত নারীকে উ’দ্ধার করে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতা’লে ভর্তি করে। ওসিসিতে তিনদিন চিকিৎসা নিয়ে বাড়ি ফেরেন তিনি। ওই রাতেই গণধ’র্ষণের শিকার গৃহবধূর স্বামী বাদী হয়ে মহানগরের শাহ্‌পরাণ থা’নায় আওয়ামী লীগ নেতা রঞ্জিত সরকারের অনুসারী ছয় ছাত্রলীগ নেতার বি’রুদ্ধে মা’মলা করেন। গ্রে’প্তারের পর আটজন আ’সামিকে পর্যায়ক্রমে পাঁচদিন করে রি’মান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে পু’লিশ। রি’মান্ড শেষে আ’দালতে ১৬৪ ধারায় জবানব’ন্দি দেয় তারা। জবানব’ন্দিতে প্রধান আ’সামি সাইফুর, তারেক, শাহ মাহবুবুর ও অর্জুন লস্কর ধ’র্ষণের কথা স্বীকার করে। রবিউল ও মাহফুজুর ধ’র্ষণে সহায়তা করার কথা স্বীকার করে। স’ন্দেহভাজন আ’সামি মিসবাউর রহমান ওরফে রাজন ও আইনুদ্দিন জবানব’ন্দি দেন। পু’লিশ এই আটজনকে অ’ভিযু’ক্ত করে ৩রা ডিসেম্বর আ’দালতে চার্জশিট জমা দিয়েছে।

পু’লিশ ফাঁড়িতে রায়হান হ’ত্যা: মাত্র ১০ হাজার টাকা না পেয়ে ১১ই অক্টোবর ভোরে সিলেট নগরীর আখালিয়া এলাকার বাসিন্দা রায়হান আহম’দকে বন্দরবাজার পু’লিশ ফাঁড়িতে এনে অমানবিক নি’র্যাতন করেন এসআই আকবর ভূঁইয়াসহ আরো কয়েকজন পু’লিশ সদস্য। পরে সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতা’লে তার মৃ’ত্যু হয়। এ ঘটনায় নি’হত রায়হানের স্ত্রী’ তাহমিনা আক্তার তান্নী বাদী হয়ে ১২ই অক্টোবর কোতোয়ালি থা’নায় একটি হ’ত্যা মা’মলা করেন। রায়হান হ’ত্যা মা’মলায় এসআই আকবরসহ চার পু’লিশ সদস্যকে গ্রে’প্তার করা হয়েছে। এ ঘটনায় বন্দর বাজার ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই আকবর, হাসান উদ্দিনসহ পাঁচ জনকে সাময়িক বরখাস্ত এবং তিনজনকে প্রত্যাহার করা হয়। ৯ই নভেম্বর কানাইঘাট উপজে’লার লক্ষ্মীপ্রসাদ ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে মা’মলার প্রধান আ’সামি এসআই আকবরকে গ্রে’প্তার করা হয়।

টাকার কুমির স্বাস্থ্যর গাড়িচালক মালেক: স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের চতুর্থ শ্রেণির কর্মক’র্তা আব্দুল মালেক (৬৩) গাড়িচালক হয়ে টাকার কুমির হয়েছেন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের গাড়ি ব্যবহার করতেন মালেক। প্রভাবশালী এই গাড়িচালক স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়োগ, বদলিসহ নানা অনিয়ম করে শ’ শ’ কোটি টাকার মালিক। ২০শে সেপ্টেম্বর তাকে গ্রে’প্তার করে র‌্যা’­ব। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের গাড়িসহ আরও তিনটি প্রকল্পের গাড়ি নিজের কব্জায় রেখেছিল। অধিদপ্তরের নিয়োগ বাণিজ্য থেকে শুরু করে ক্রয়, টেন্ডারবাজি ছিল তার নিয়ন্ত্রণে। সূত্র: মানবজমিন।

Check Also

প্রধানমন্ত্রীর কাছে খালেদা জিয়ার আবেদন

বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার দু’র্নী’তির দায়ে দ’ণ্ডি’ত সা’জা স্থগিত করে মু’ক্তির মেয়াদ পূর্বের শর্তে …