নূপুরের টার্গেট ঢাকার বিত্তশালীরা

পারভীন আক্তার নূপুর। রাজধানীর অভিজাত এলাকার বাসিন্দা। চেহারায় আভিজাত্যের ছাপ। শুধু নূপুর নয়, সঙ্গে রয়েছে তার বড় বোন শেফালী। নূপুর স্বেচ্ছাসেবী থেকে হয়ে যায় অলটাইম প্রেমিকা। নানা পরিচয়ে, নানা অজুহাতে টার্গেটকৃত ব্যক্তির কাছাকাছি যান এই তরুণী। মূল লক্ষ্যে পৌঁছেই প্রকাশ করেন আসল রূপ। অন্তরঙ্গ কথোপকথনসহ বিভিন্ন ডকুমেন্ট সংগ্রহ করে হুমকি দেন।

দাবি করেন মোটা অঙ্কের টাকা। এভাবেই ব্ল্যাকমেইল করে কেড়ে নেন সর্বস্ব। প্রতারক চক্রের মূল হোতাদের অন্যতম নূপুর। তার সঙ্গে রয়েছে প্রতিষ্ঠিত টেলিকম কোম্পানির চাকরিজীবীও। সমাজের অন্তত ২০ জন ধনাঢ্য ব্যক্তিকে ব্ল্যাকমেইল করে একের পর এক বিপুল অর্থ কেড়ে নিয়েছে এই চক্র। বিষয়টি গড়িয়েছে থানা পুলিশ পর্যন্ত। এ পর্যন্ত এই চক্রের বিরুদ্ধে তিনটি মামলা করা হয়েছে। সর্বশেষ গত ১৫ই ডিসেম্বর টেলি যোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ আইনে একটি মামলা করা হয়েছে। গ্রেপ্তারের পর রিমান্ডে চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছে এই চক্রের মূল হোতা নূপুর।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, নিজের কণ্ঠ ও চেহারাকে পুঁজি করে ফাঁদ পাতে ত্রিশ বছর বয়সী নূপুর। স্বামীর সঙ্গে বিচ্ছেদ হয়েছে দীর্ঘদিন আগে। তার বড় বোন শেফালীর স্বামী থাকেন সৌদিতে। সংসারহীন দুই বোন রাতারাতি কোটি টাকার মালিক হওয়ার আশাতে শুরু করে ভিন্নরকম মিশন। এই মিশনের মূল হোতা নূপুর। শিল্পপতি, ব্যবসায়ীদের টার্গেট করে সে। সুবিধা বঞ্চিত শিশুদের নিয়ে কাজ করছে জানিয়ে তাদের সহযোগিতা চায়। সাক্ষাৎ করতে চায় তাদের সঙ্গে।

নানা অজুহাতে দিনের পর দিন ফোনে কথা বলে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করে। কথা হয় রাত-বিরাতে। কথায় কথায় কৌশলে আবেগপ্রবণ করে তোলে নূপুর। এসব কথা রেকর্ড করা হয়। তারপর ওই ব্যক্তির মোবাইলফোনের সংযোগ রেজিস্ট্রেশন অনুসারে তথ্য সংগ্রহ করে। এটি করা হয় গ্রামীণফোনের ক্ষেত্রে। কারণ ওই টেলিকম কোম্পানির সার্ভিস সেন্টারে কর্মরত রুবেল মাহমুদ অনিক এই চক্রের সদস্য। তথ্য সংগ্রহ করার মধ্যেই চক্রটি থেমে থাকে না। টার্গেটকৃত ব্যক্তির স্ত্রী, সন্তান থেকে শুরু করে স্বজনদের তথ্যও সংগ্রহ করা হয়।

গভীর প্রণয়ের ফোনালাপ রেকর্ড করার পর সময় সুযোগ বুঝেই নিজের আসল চেহারা প্রকাশ করে নূপুর। দাবি করা হয় মোটা অঙ্কের টাকা। অন্যথায় ফোনের রেকর্ড, আপত্তিকর কথোপকথন পাঠানো হবে ওই ব্যক্তির স্ত্রী, সন্তান ও স্বজনদের কাছে। প্রয়োজনে ভাইরাল করা হবে। সামাজিক মর্যাদার কথা ভেবে অনেকেই নূপুরের দাবিকৃত টাকা নীরবে দিয়েছেন। তাদের একজন ৬০ বছর বয়সী এক ধনাঢ্য ব্যক্তি। যার কাছ থেকে প্রায় সাড়ে ৫ লাখ টাকা লুটে নিয়েছে নূপুর চক্র।

টাকা আদায় করতে গিয়ে অনেক ক্ষেত্রে বিষয়টি আরো জটিল করে তোলে চক্রটি। প্রতারণা নাট্যের এই দৃশ্যে হাজির হন চক্রের আরেক সদস্য নূপুরের বড় বোন শেফালী বেগম। সাধারণত টার্গেটকৃত ব্যক্তির অফিসে যান তিনি। সোজা কথায় কাজ না হলে অফিসেই চিৎকার শুরু করেন। অভিযোগ করেন, ‘আপনি আমার বোনের সর্বনাশ করেছেন। তাকে সরল-সোজা পেয়ে যেভাবে খুশি ব্যবহার করেছেন। আপনি দুশ্চরিত্রের লোক।’ কথায় কথায় জানিয়ে দেন বিয়ে না করেন সমস্যা নেই। নূপুরের ভবিষ্যতের জন্য দাবিকৃত টাকা দিতে হবে। নতুবা এর পরিণতি খারাপ হবে। মামলা করা হবে।’ এভাবেই হুমকি-ধমকি দিয়ে অর্থ আদায় করে এই চক্র।

গ্রামীণফোন কোম্পানিতে কর্মরত রুবেল মাহমুদ অনিকের কাছ থেকে সর্বশেষ গত ৩রা ডিসেম্বর ৬টি সংযোগ (সিম) ব্যবহারকারীদের তথ্য সংগ্রহ করে পারভীন আক্তার নূপুর। সেদিন সন্ধ্যা থেকে রাত সাড়ে ৮টা পর্যন্ত হাতিরঝিলের একটি রেস্টুরেন্টে কথা বলে অনিক ও নূপুর। শুরুতেই একটি ভাজ করা সাদা কাগজে লিখে আনা ৬টি সংযোগ ব্যবহারকারীর জন্ম তারিখ ও এনআইডি নম্বর দেয় অনিক। তার আগেই
এই চক্র সম্পর্কে তথ্য পেয়ে যায় পুলিশ। অনুসন্ধানে মেলে সত্যতা।

গত ৪ঠা ডিসেম্বর অভিযানে নামে পুলিশ। গ্রেপ্তার করা হয় পারভীন আক্তার নূপুর, শেফালী বেগম ও তাদের সহযোগী সামসুদ্দোহা খান বাবুকে। প্রতারণার অভিযোগে মামলা করেন এক ভুক্তভোগী। ধনাঢ্যদের ফোন নম্বর সংগ্রহ ও টাকা আদায়ে সহযোগিতা করতো শেফালী বেগম ও সামসুদ্দোহা খান বাবু। পরবর্তীতে গত ৬ই ডিসেম্বর রাতে অভিযান চালিয়ে গ্রেপ্তার করা হয় রুবেল মাহমুদ অনিককে। অভিযানকালে মোবাইলফোন, সংযোগ ও এনআইডি নম্বর, জন্ম তারিখ লেখা সংবলিত কাগজ জব্দ করে পুলিশ।

এ ঘটনায় ৭ই ডিসেম্বর পুলিশ পরিদর্শক মহিউদ্দিন ফারুক বাদী হয়ে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে হাতিরঝিল থানায় মামলা দায়ের করেন। মামলায় গ্রামীণফোনে কর্মরত অনিকের বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয়, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা সংরক্ষণে ব্যর্থতা, উদাসীনতা ও তথ্য ভাণ্ডারে বেআইনি প্রবেশ নিয়ন্ত্রণে গ্রামীণফোন কর্তৃপক্ষের অব্যস্থাপনা রয়েছে।

এর সুযোগ নিয়ে গ্রামীণফোন সার্ভিস সেন্টারে কর্মরত রুবেল মাহমুদ অনিক ব্ল্যাকমেইলিং পার্টির মূল হোতা পারভীন আক্তার নূপুরকে তার চাহিদামতো গ্রাহকদের ব্যক্তিগত তথ্য সরবরাহ করতো। এছাড়াও গত ১৫ই ডিসেম্বর টেলি যোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ আইনে আরো একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। মামলায় গ্রামীণফোন লিমিটেডে কর্মরত রুবেল মাহমুদ অনিক ও প্রতারক পারভীন আক্তার নূপুরকে আসামি করা হয়েছে।

ডিএমপি’র তেজগাঁও বিভাগের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার মো. হাফিজ আল ফারুক জানান, চক্রটি দীর্ঘদিন ধরে প্রতারণা করে আসছিল। সমাজের ধনাঢ্যদের সঙ্গে অন্তরঙ্গ সম্পর্ক গড়ে ব্ল্যাকমেইল করতো। গ্রামীণফোনে কর্মরত অনিকের সহযোগিতায় ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করে তাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের হুমকি দিতো। এই চক্রটি অনেকের কাছ থেকে বিপুল টাকা হাতিয়ে নিয়েছে বলে জানান তিনি।

গ্রেপ্তার নূপুর (৩০) হবিগঞ্জের আজমিরীগঞ্জের শিবপাশা গ্রামের মতিউর রহমানের মেয়ে, নূপুরের বড় বোন শেফালী বেগম (৩৫), রংপুর সদরের ইসলামপুর হনুমানতলার সহিদুর রহমান খানের পুত্র সামসুদ্দোহা খান বাবু (৩৬) ও গ্রামীণফোনে কর্মরত রুবেল মাহমুদ অনিক (২৭) বরিশাল সদরের কালীবাড়ি রোডের এমএ সালেকের পুত্র।

Check Also

নিশির ছোট্ট শরী’রের কো’থাও বাদ রা’খেনি ব্যাং’ক ক’র্মক’র্তা ও তার স্ত্রী, ফে’রত দি’তে গি’য়ে ধ’রা

নিশির ছোট্ট শ’রীরের কোথাও বাদ রাখেনি ব্যাংক ক’র্মকর্তা ও তার স্ত্রী, ফেরত দিতে গিয়ে ধ’রাজানে …