দেড় যুগ পর শিকল মুক্ত হলো দুই বোন

ছোট্ট একটি ঘরে প্রায় দেড় যুগ ধরে শিকলে বেঁধে রাখা হয়েছে দুই বোন পাপড়ি ও অনন্যাকে অবশেষে প্রশাসনের হস্তক্ষেপে দেড় যুগ পর শিকল মুক্ত করা হলো। দেড় যুগ আগে দুই বোনকে একটি ঘরে পায়ে শিকল লাগিয়ে তালাবন্ধ করে রাখা হয়েছিলো। কারণ তারা মানসিক ভা’রসাম্যহীন আর প্রতিবেশিদের জন্য নাকি যন্ত্র’ণাদায়ক। তাদের যত্ন নেওয়ার কেউ নেই। পার না ঠিকমতো খাবার। ফলে অসহায় দুই বোন ভুগছেন পুষ্টিহীনতায়।

পাপড়ি (২৬) ও অনন্যার (২২) বাড়ি জামালপুর জে’লার মাদারগঞ্জ উপজে’লার আদারভিটা ইউনিয়নের আদারভিটা গ্রামে। মা-বাবা মা’রা গেছেন অনেক আগে। এখন ছোট ভাই সম্রাট (২৫) দেখাশোনা করেন তাদের। আরেক ভাই মুশফিকুর রহমান (১৭) অষ্টম শ্রেণিতে লেখাপড়া করত। অভাবের সংসারে তার স্কুলে যাওয়া বন্ধ।

জানা গেছে, আদারভিটা গ্রামে লাল মামুদ সরকার বাড়ি নামে পরিচিত। ওই গ্রামের মৃ’ত আবদুল মান্নানের মে’য়ে পাপড়ি ও অনন্যা। তাদের একটি ঘরে শিকল পরিয়ে আ’ট’কে রাখা হয়েছে। এই অবস্থায় চলে খাওয়া-দাওয়া ও অন্যান্য প্রাকৃতিক কাজকর্ম।

পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, মাদারগঞ্জ উপজে’লার আদারভিটা উচ্চ বিদ্যালয়ে অষ্টম শ্রেণিতে পড়া অবস্থায় ১৯৯৯ সালে পাপড়ি খাতুন ধীরে ধীরে মানসিক ভা’রসাম্য হারাতে শুরু করেন। এরপর ২০০১ সালে ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়া অবস্থায় অনন্যা খাতুনের একই রকমের মানসিক সমস্যা দেখা দেয়। তাদের আচরণ দিন দিন অস্বাভাবিক হতে শুরু করে। একপর্যায়ে তারা দুজনই মানসিক ভা’রসাম্য হারিয়ে ফেলেন। এতে করে তাদের স্কুলে যাওয়া বন্ধ হয়ে যায়। তাদের বাবা আবদুল মান্নান জামালপুরে পরিসংখ্যান ব্যুরো কার্যালয়ে ছোট পদে চাকরি করতেন। দুই মে’য়েকে নিয়ে বিপাকে পড়েন তিনি। দুই বোন প্রতিবেশিদের বাড়িতে গিয়ে নানা সমস্যার সৃষ্টি শুরু করেন। এ জন্য প্রতিবেশিদের নানা কথাও শুনতে হয় আবদুল মান্নানকে। এতে নিরুপায় হয়ে দুই মে’য়েকে শিকল পরিয়ে ঘরে আ’ট’ক রেখে লালনপালন শুরু করেন তিনি। শিকল পরানোর পর থেকে দুই বোন আরো বেশি মানসিক ভা’রসাম্যহীন হয়ে পড়েন।

একপর্যায়ে বাবা আবদুল মান্নান ২০১০ সালে মস্তিষ্কে র’ক্তক্ষরণজনিত কারণে মা’রা যান। এরপর ২০১৪ সালে তাঁদের মা শাহিনা পারভীনও মা’রা যান। ছোট দুই ভাইয়ের জীবনে শুরু হয় নতুন ল’ড়াই। এর মধ্যে সম্রাট এখন ওই পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। তার সামান্য আয়ে তাদের দুই বোনের লালনপালন ও ছোট ভাইয়ের পড়ালেখার খরচ চালানো খুবই ক’ষ্ট’কর হয়ে পড়ে।

জানতে চাইলে সম্রাট মিয়া বলেন, আমাদের বাবা একটি ছোট চাকরি করতেন। নিজের বলতে দেড় বিঘা কৃষিজমি রেখে গেছেন। অভাবের তাড়নায় তা অনেক আগেই বন্ধক রাখতে হয়েছে। পুরো সংসারের দায়িত্ব আমা’র কাঁধে। অনেক সময় খাবারও সংগ্রহ করতে পারি না। এর মধ্যে বোনদের চিকিৎসা করাব কিভাবে। শিকলমুক্ত করলে তারা কারো ক্ষতি করতে পারেন! তাই তাদের শিকল পরিয়ে বেঁধে রাখি। কেউ আমা’র দুই বোনের চিকিৎসার দায়িত্ব নিলে আম’রা চিরদিন তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকব।

পাপড়ি ও অনন্যার এক চাচা আবদুল হাই বলেন, টাকার অভাবে দুই বোনের চিকিৎসা করানো যাচ্ছে না। ভালো চিকিৎসা করানো হলে অবশ্যই তারা স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পারবে। দুই বোনের খবর সামাজিক মাধ্যম ও গণমাধ্যমে প্রকাশ হলে সোমবার বিকালে জে’লা প্রাশাসকের নির্দেশে মাদারগঞ্জ উপজে’লা নির্বাহী কর্মক’র্তা মো: আবুল মনসুর ঘটনাস্থলে গিয়ে শিকল ব’ন্দি দুই বোনের খোঁজখবর নেন এবং তাদেরকে শিকল মুক্ত করেন এবং চিকিৎসা র ব্যাবস্থা করা হবে বলে জানান। এ সময় ঐ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আলতাফুর রহমান আতা উপস্থিত ছিলেন।

Check Also

ধেয়ে আসছে বিশালাকার গ্রহাণু

একটি বিশালাকার গ্রহাণু ধেয়ে আসছে পৃথিবীর দিকে। আন্তর্জাতিক মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা জানিয়েছে, এটি পৃথিবীর …